চাকরি কিংবা পেশাগত জীবনের প্রথম দরজাটিই হলো জীবনবৃত্তান্ত। একজন চাকরিপ্রার্থী কী শিখেছেন, কী জানেন, কী পারেন এবং ভবিষ্যতে কীভাবে নিজেকে উপস্থাপন করতে চান—তার সংক্ষিপ্ত অথচ সুস্পষ্ট প্রতিফলন ঘটে একটি ভালোভাবে প্রস্তুত করা জীবনবৃত্তান্তে। বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক কর্মবাজারে শুধু শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জন করলেই যথেষ্ট নয়; সেই যোগ্যতাকে সঠিকভাবে উপস্থাপন করার দক্ষতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আর এই উপস্থাপনার প্রধান মাধ্যম হলো জীবনবৃত্তান্ত বা কারিকুলাম ভিটাই (CV)।
এই পাঠে আমরা বাংলা ও ইংরেজি—উভয় ভাষায় জীবনবৃত্তান্ত লেখার প্রয়োজনীয়তা, গুরুত্ব, ধরন ও প্রস্তুতপ্রণালী সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব। এটি “বাউবি এসএসসি ২৩৫৮ ক্যারিয়ার শিক্ষা” বিষয়ের “কর্মক্ষেত্র নির্বাচন এবং ক্যারিয়ার উন্নয়ন” ইউনিট–৪-এর অন্তর্ভুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, যা শিক্ষার্থীদের বাস্তব কর্মজীবনের জন্য প্রস্তুত হতে সহায়তা করবে। জীবনবৃত্তান্ত কীভাবে সাজালে তা নিয়োগকর্তার দৃষ্টি আকর্ষণ করবে, কোন তথ্যগুলো কতটা গুরুত্ব দিয়ে উপস্থাপন করতে হবে এবং কীভাবে নিজেকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলে ধরা যায়—এসব বিষয়ই এই আলোচনার মূল লক্ষ্য।

Table of Contents
জীবন বৃত্তান্ত লেখা (বাংলা ও ইংরেজি)
নিজেকে অন্যের কাছে উপস্থাপন করা খুব কঠিন একটা কাজ। সামনা সামনি কথোপকথনের মাধ্যমে নিজেকে প্রকাশ করা অনেক ক্ষেত্রে হয় না। তাই আবেদন পত্রের মাধ্যমে নিজেদের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরতে হয়। এই পাঠে তা-ই উপস্থাপন করছি।
জীবন বৃত্তান্ত কেন দরকার?
জীবনবৃত্তান্ত বা কারিকুলাম ভিটাই (Curriculum Vitae – CV) চাকরির আবেদনের ক্ষেত্রে একটি অপরিহার্য নথি। প্রায় সব ধরনের চাকরির ক্ষেত্রেই আবেদনকারীর কাছ থেকে জীবনবৃত্তান্ত চাওয়া হয়। কোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরির জন্য আবেদন করতে হলে প্রার্থীকে অবশ্যই তার জীবনবৃত্তান্ত চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানে জমা দিতে হয়। এটি মূলত প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও ব্যক্তিগত পরিচয়ের একটি সংক্ষিপ্ত অথচ পূর্ণাঙ্গ লিখিত দলিল।
চাকরির বাজারে প্রতিটি পদের বিপরীতে অসংখ্য আবেদন জমা পড়ে। এই বিপুল সংখ্যক জীবনবৃত্তান্তের মধ্য থেকে প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদ বিভাগ প্রাথমিকভাবে যে নথিটি বিচার করে, সেটি হলো জীবনবৃত্তান্ত। তাই একটি সুগঠিত, স্পষ্ট ও আকর্ষণীয় জীবনবৃত্তান্তই প্রার্থীকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলতে পারে। বলা যায়, জীবনবৃত্তান্তই চাকরিপ্রার্থীর প্রথম পরিচয়পত্র এবং প্রথম ছাপ সৃষ্টির প্রধান মাধ্যম।
বর্তমান ডিজিটাল যুগে ইন্টারনেটে অনুসন্ধান করলে নানা ধরনের জীবনবৃত্তান্তের নমুনা ও ফরম্যাট সহজেই পাওয়া যায়। এসব নমুনা নতুন প্রার্থীদের জন্য সহায়ক হলেও, অভিজ্ঞ কোনো চাকরিজীবীর ব্যবহৃত জীবনবৃত্তান্ত থেকে ধারণা নেওয়া আরও কার্যকর হতে পারে। কারণ অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের জীবনবৃত্তান্তে অনেক বাস্তবমুখী দিক, দক্ষতার উপস্থাপন কৌশল ও পেশাগত ভাষার ব্যবহার থাকে, যা নতুনদের চিন্তায় সহজে নাও আসতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—নিয়োগকর্তা প্রার্থীকে প্রথমে মূল্যায়ন করেন তার জীবনবৃত্তান্ত দেখে। কোনো প্রার্থীকে সাক্ষাৎকারে ডাকা হবে কি না, সে সিদ্ধান্তের বড় অংশ নির্ভর করে জীবনবৃত্তান্তের মান, গঠন ও উপস্থাপনার উপর। তাই একটি পরিকল্পিত, প্রাসঙ্গিক ও পেশাদার জীবনবৃত্তান্ত চাকরি পাওয়ার পথে প্রথম এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচিত।
জীবন বৃত্তান্তের প্রকার:
১. একাডেমিক জীবন বৃত্তান্ত এবং
২. প্রফেশনাল (পেশাদার) জীবন বৃত্তান্ত।
একাডেমিক জীবনবৃত্তান্ত সাধারণত দেশে বা বিদেশে বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি কিংবা গবেষণার জন্য আবেদন করার ক্ষেত্রে প্রয়োজন হয়। অন্যদিকে, প্রফেশনাল বা পেশাদার জীবনবৃত্তান্ত মূলত চাকরির আবেদনের সময় ব্যবহার করা হয়।
এখানে আমরা প্রফেশনাল জীবন বৃত্তান্ত সম্পর্কে আলোচনা করব।
পেশায় সম্পৃক্ত হওয়ার জন্য প্রথমেই চাই সুন্দর ও গোছানো জীবন বৃত্তান্ত। জীবন বৃত্তান্ত সাজানোর কলাকৌশল নিচে উপস্থাপন করা হলো:
একটি আদর্শ জীবন বৃত্তান্ত: বিষয়বস্তু, বৈশিষ্ট্য ও প্রস্তুতপ্রণালী
জীবন বৃত্তান্তে অন্তর্ভুক্ত মৌলিক বিষয়সমূহ
একটি পূর্ণাঙ্গ ও গ্রহণযোগ্য জীবন বৃত্তান্তে সাধারণত নিম্নলিখিত তথ্যগুলো সুসংগঠিতভাবে উপস্থাপন করা হয়—
- প্রার্থীর সদ্য তোলা ছবি, পূর্ণ নাম এবং বর্তমান যোগাযোগের ঠিকানা (মোবাইল নম্বর ও ই-মেইলসহ)
- পিতা-মাতার নাম, পরিচয় ও পেশাগত তথ্য
- শিক্ষাগত যোগ্যতা: অর্জিত একাডেমিক ডিগ্রি, ফলাফল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম, পাশের সাল এবং প্রাসঙ্গিক প্রফেশনাল কোর্স বা প্রশিক্ষণের বিবরণ (যদি থাকে)
- সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রম, সাংগঠনিক সম্পৃক্ততা ও বিশেষ অর্জনের সংক্ষিপ্ত বিবরণ
- কর্মঅভিজ্ঞতা: পদবি, প্রতিষ্ঠান, দায়িত্ব ও কাজের সময়কাল (অভিজ্ঞতা থাকলে)
- দুইজন প্রত্যয়নকারীর নাম, পরিচয়, পদবি ও যোগাযোগের ঠিকানা
জীবন বৃত্তান্তের দৈর্ঘ্য ও জমাদান পদ্ধতি
জীবনবৃত্তান্ত অতিরিক্ত দীর্ঘ হওয়া উচিত নয়। কারণ, অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান চাকরির জন্য বিপুলসংখ্যক সিভি পায় এবং মানবসম্পদ বিভাগ সাধারণত সংক্ষিপ্ত ও প্রাসঙ্গিক তথ্যকে অগ্রাধিকার দেয়।
বর্তমানে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান তাদের ওয়েবসাইট বা নির্দিষ্ট ই-মেইলের মাধ্যমে জীবনবৃত্তান্ত গ্রহণ করে। অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি বিজ্ঞপ্তি না থাকলেও প্রতিষ্ঠান ভবিষ্যৎ প্রয়োজনের কথা বিবেচনা করে ওয়েবসাইটে সিভি জমা রাখার সুযোগ দেয়, যাতে উপযুক্ত সময়ে প্রার্থীকে সাক্ষাৎকারের জন্য ডাকা যায়।
আদর্শ জীবন বৃত্তান্তের বৈশিষ্ট্য
একটি মানসম্মত জীবনবৃত্তান্তের মধ্যে নিম্নলিখিত গুণাবলি থাকা বাঞ্ছনীয়—
- তথ্য উপস্থাপনে স্পষ্টতা ও নির্ভুলতা
- বানান ও ভাষাগত ভুলমুক্ত লেখা
- কোনো তথ্য নিয়ে দ্ব্যর্থতা বা অস্পষ্টতা না থাকা
- সংক্ষিপ্ত অথচ পূর্ণাঙ্গ উপস্থাপন
- অল্প কথায় শিক্ষাগত ও পেশাগত অর্জনের সারাংশ তুলে ধরা
- অর্জিত দক্ষতা ও সক্ষমতার সুস্পষ্ট উল্লেখ
- সাবলীল, প্রমিত ও পেশাদার ভাষার ব্যবহার
জীবন বৃত্তান্ত সাজানোর কলাকৌশল
জীবন বৃত্তান্ত প্রস্তুতের সময় কিছু কৌশল অনুসরণ করলে তা আরও গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে—
- সাধারণত সিভি ইংরেজিতে লেখা উত্তম; তবে প্রতিষ্ঠানের চাহিদা অনুযায়ী বাংলাতেও লেখা যেতে পারে। ইংরেজিতে Times New Roman এবং বাংলায় এ্যসকিতে লিখলে SutonnyMJ ফন্ট ব্যবহার করা যেতে পারে। শব্দের মধ্যে এক স্পেস এবং লাইনের মধ্যে ১.৫ স্পেস রাখা শ্রেয়। তবে বাংলায় ইউনিকোড ব্যবহার করলে পুরোটা যেন ইউনিকোড হয়, মিশ্র যেন না হয়।
- তথ্যগুলো ধারাবাহিক ও যুক্তিসংগতভাবে সাজাতে হবে, যেন পাঠকের আগ্রহ বজায় থাকে।
- অপ্রয়োজনীয় বিবরণ বাদ দিয়ে অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার মূল দিকগুলো স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে।
- সদ্য তোলা ছবি এবং হালনাগাদ যোগাযোগের ঠিকানা অবশ্যই যুক্ত করতে হবে।
- প্রাসঙ্গিক ও পেশাগত শব্দচয়ন করতে হবে এবং সংক্ষেপে বক্তব্য উপস্থাপন করতে হবে।
- জীবনবৃত্তান্তের শেষে একটি ঘোষণা সংযোজন করা উচিত, যেখানে প্রার্থী উল্লেখ করবেন যে প্রদত্ত সকল তথ্য সত্য ও সঠিক—এটি স্বপ্রত্যায়নের অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়।
স্বাক্ষর প্রদানের মাধ্যমে একটি বাংলা ও ইংরেজি জীবন বৃত্তান্তের নমুনা দেওয়া হলঃ




কাজ: তোমার নিজের একটা জীবন বৃত্তান্ত তৈরি কর ৷
সারসংক্ষেপ
চাকরি প্রার্থী নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী যথাযথ ঠিকানায় নিজের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা উল্লেখ করে যে পত্র পাঠায় তাই জীবন বৃত্তান্ত ।এটা সুন্দর সাজানোর মাধ্যমে প্রার্থীর ভেতরের সৌন্দর্য সাধারণ্যে উপস্থাপিত হয়। তাই আপনারা চমৎকারভাবে আবেদন পত্র লিখতে পারবেন এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
জীবন বৃত্তান্ত ফরম ডাউনলোড:
বাংলা
- জীবন বৃত্তান্ত ফাইল ফরমেট ডাউনলোড – ওয়ার্ড
- জীবন বৃত্তান্ত ফাইল ফরমেট ডাউনলোড – পিডিএফ
- বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড এর কর্মচারী-কর্মকর্তাদের জীবন বৃত্তান্ত ফরম
ইংরেজি:
