সংযোগ স্থাপন ও ক্যারিয়া আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়। এই পাঠটি “বাউবি এসএসসি ২৩৫৮ ক্যারিয়ার শিক্ষা” এর “ক্যারিয়ার গঠনে সংযোগ স্থাপন ও আচরণ” ইউনিট ৩ এর অন্তর্ভুক্ত।
Table of Contents
সংযোগ স্থাপন ও ক্যারিয়ার
মানুষ যখন চাকরি চায় অথবা তা পায়, দুই ক্ষেত্রেই পরবর্তী উন্নয়নের প্রসঙ্গটি চলে আসে। চাকরি যদি চায় তাহলে নিজেকে সেজন্য প্রস্তুত করে তুলতে হয় এবং চাকরি যদি পায় তবে সেক্ষেত্রে নিজের অস্তিত্ব রক্ষা করা ও পরবর্তী পর্যায়ে উন্নতি করা সব কিছুর জন্যই প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হয়। ব্যক্তির সাথে ব্যক্তির সম্পর্ক স্থাপন এই প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার নামান্তর।
অর্থাৎ উভয় ক্ষেত্রেই মানুষের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করা অত্যাবশ্যক। মানুষ সামাজিক জীব। তার অন্যতম কারণ জীবনে বেঁচে থাকার জন্য প্রতি মুহুর্তে মানুষকে একে অপরের উপর নির্ভর করতে হয়। পেশাগত জীবনে মানুষ ক্ষুদ্র কোন সামাজিক প্রতিষ্ঠানে অবস্থান ও জীবিকা নির্বাহ করতে শুরু করে। এখানেও প্রতি পদক্ষেপে এবং অগ্রযাত্রায় তাকে পারস্পারিক সম্পর্ক রচনা ও রক্ষা করতে হয়। এভাবে দেখা যায় সামাজিক জীবনের যে স্তরই হোক না। কেন পারস্পারিক সংযোগ স্থাপন একটি অন্যতম শর্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। যাকে আমরা কোন কারণেই এড়িয়ে যেতে পারি না।
সংযোগ স্থাপন ও ক্যারিয়ার
যোগাযোগ স্থাপন বলতে প্রথমেই আমাদের চিন্তায় কী আসে একবার ভেবে দেখ তো। দুটো জিনিসকে সংযুক্ত করা কিংবা একাধিক বস্তুকে একসাথে যুক্ত করা, তাই না? ইলেকট্রনিকস হলে বৈদ্যুতিক তার দিয়ে যুক্ত করা যেতে পারে, অন্য কোনো বস্তু হলে অন্য কোনোভাবে । কিন্তু একাধিক ব্যক্তিকে কি একসাথে যুক্ত করা যায়? তাহলে তোমরা অন্যের সাথে সংযোগ স্থাপন করবে কীভাবে?
মানুষ সামাজিক জীব। সমাজে সকল মানুষ পাশাপাশি একত্রে বসবাস করে। এই মানুষেরা কি পরস্পরের সাথে যুক্ত? এমন কী হতে পারে যে, সমাজের সকল মানুষ আসলে অদৃশ্য কোনো বন্ধনে পরস্পরের সাথে সংযুক্ত? আমরা কি জানি- সেই অদৃশ্য বন্ধন কী?
মানুষ হিসেবে আমরা একে অন্যকে যেমন শ্রদ্ধা করি, তেমনি দল-মত নির্বিশেষে একসাথে মিলেমিশে বসবাস করতে চাই । পৃথিবীর সকল মানুষ আসলে মায়ার অদৃশ্য বন্ধনে আবদ্ধ । পরিচিতজনদের প্রতি আমাদের এই মায়ার পরিমাণটা অনেক বেশি। আমরা আমাদের পরিচিতজনদের কাছাকাছি থাকতে চাই, সবসময় তাদের মঙ্গল কামনা করি।
এভাবে আমরা দেখতে পাই যে, শুধু সামাজিক জীবনেই নয়, কর্মক্ষেত্রেও এই একই ব্যাপার বিদ্যমান। কর্মক্ষেত্রে সকলেই একটি অদৃশ্য বন্ধনে পরস্পরের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে থাকে । কর্মক্ষেত্রের জন্য নিজেকে তৈরি করতে হলে অনেক কিছু জানতে হবে, শিখতে হবে। সেসব শুধু বই পড়ে শেখা যায় না । বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করা প্রয়োজন।
তাছাড়া, কর্মক্ষেত্রের বিশাল এক জগৎ থেকে নিজের পছন্দের কর্মক্ষেত্রের চাহিদা অনুযায়ী নিজেকে গড়ে তুলতে হলে চাই একে অপরের সাথে জানাশোনা ও বড়দের পথনির্দেশ ।

কাজ – এক
নিচের এ কাজটি করলে আপনি অন্য কোন ব্যক্তি বা কোন পরিস্থিতির সাথে কতটা সংযোগ রক্ষা করে চলতে পারেন তা যাচাই করতে পারবেন। নিচের বাক্যগুলোর মধ্যে কোনটি আপনার জন্য প্রযোজ্য টিক (√) চিহ্ন দিন।

সংযোগ কী ?
সংযোগ হল একজন ব্যক্তির সাথে অন্য আর একজন ব্যক্তির বা একটি দলের সাথে অন্য আর এক দলের সম্পর্ক গড়ে তোলা। এ ধরনের সম্পর্ক স্থাপনকে আমরা এক কথায় জনসংযোগও বলতে পারি। পেশাগত ক্ষেত্রে এ সম্পর্কের মাধ্যমে দুয়ের মধ্যে আদান-প্রদান ঘটে। যেমন, তথ্য বা ভাব বিনিময়, একে অপরকে পেশাগত কোন সাহায্য করা বা পেশাগত কোন উপাদান বিনিময় ইত্যাদি। এর ফলে দুইজন বা বহু ব্যক্তির মধ্যে সম্পর্কের জাল বিন্যস্ত হয়। অর্থাৎ নির্দিষ্ট কোন ক্ষেত্রে পারস্পারিক সাহায্য সহযোগিতার মাধ্যমে একটি সুষম ব্যবস্থা তৈরি হয় যেখানে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠী পরস্পরের উপর নির্ভর করে ও নিশ্চিন্তে অবস্থান করে ।
পারস্পারিক সংযোগের প্রয়োজনীয়তা
সাধারণত ব্যক্তি বা দলের স্বার্থে পারস্পারিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তবে ব্যক্তির সাথে ব্যক্তির বা দলের অথবা দলের সাথে দলের বা ব্যক্তির সম্পর্ক গড়ে ওঠার পিছনে নানাবিধ কারণ রয়েছে। আসুন এসব কারণের মধ্যে পেশাক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কারণসমূহ কী তা দেখি ।
• চাকরি খোঁজা ও পাওয়ার জন্য: একজন ব্যক্তি যখন চাকরি পাওয়ার ইচ্ছা রাখে তখন তাকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে হয়। বিশেষ করে ব্যক্তির যোগ্যতা ও দক্ষতা অনুযায়ী সুবিধাজনক চাকরি কোথায় আছে তা জানতে হলে প্রতিষ্ঠানে কোন শূন্য পদ আছে কিনা তা খোঁজ করতে হয়। অথবা সংবাদপত্রে প্রকাশিত বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ব্যক্তি এ ধরনের শূন্য পদের সন্ধান পেতে পারে। তবে আপনি যদি এ পদ সম্পর্কে জানতে চান আপনাকে জনসংযোগের আশ্রয় নিতে হবে। আবার চাকরি পাওয়ার জন্য ঐ পদের প্রয়োজনীয় চাহিদা ও যোগ্যতা সম্মন্ধে খোঁজখবর করতে এক বা একাধিক ব্যক্তির সাথে সংযোগ স্থাপন করতে হয়।
• চাকরি সম্বন্ধে খোঁজখবর করার জন্য : পূর্বেই বলেছি নিজেকে কোন শূন্য পদের উপযুক্ত করে গড়ে তোলার জন্য সেই পদ সম্পর্কে খোঁজখবর করতে হয়। এজন্য ঐ প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সাথে সংযোগ স্থাপন করা প্রয়োজন । সংযোগ স্থাপনের সাহায্যে শুধু নিজেকে উপযুক্ত করে গড়ে তোলা যায় তা নয়; রবং নিজের ভিতরে ঐসব যোগ্যতা কতটা আছে তা বোঝা যায়। ফলে আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পায় এবং পূর্ণ উদ্যোম নিয়ে চাকরি পাওয়ার পথে এগিয়ে যাওয়া যায়।
• চাকরিক্ষেত্রে উৎকর্ষ ও উন্নতিলাভের জন্য: চাকরি পাওয়ার পর ঐ পদে উৎকর্ষ লাভ করার জন্য আপনাকে নিয়ত চেষ্টা করতে হবে। এর জন্য প্রতিষ্ঠানের নিচু পদ থেকে উঁচু পদ সকল ব্যক্তিবর্গের সাথে সংযোগ রক্ষা করতে হবে। এই পদের বা এর থেকে উঁচু পদের যোগ্য হয়ে উঠতে কী কী দক্ষতা অর্জন করা প্রয়োজন, কী ধরনের জ্ঞান থাকা প্রয়োজন এবং কোন কোন দ্রব্যসামগ্রী দরকার হবে তা জানার জন্য অবশ্যই জনসংযোগ রক্ষা করে চলতে হয়। এমনকি এর জন্য কোন এক বা একাধিক ব্যক্তির সাহায্য ও সহযোগিতা প্রয়োজন হলে সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে তা লাভ করা যায়। আবার নিজের উন্নতির জন্য অনেক সময় ভিন্ন কোন প্রতিষ্ঠানের সাহায্যও প্রয়োজন হতে পারে। সে ক্ষেত্রেও জনসংযোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

সংযোগ স্থাপনের পূর্বে কী ধরনের প্রস্তুতি প্রয়োজন ?
আপনি যদি কোন ব্যক্তি বা দলের সাথে সংযোগ স্থাপন করতে চান তাহলে পূর্বে আত্মানুসন্ধান করতে হবে। এটি একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। আত্মানুসন্ধানের ফলে নিজেকে জানা যায় এবং নিজেকে মূল্যায়ন করে আত্মনির্ভরশীল হওয়া যায়। অন্যের সাথে যোগাযোগের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান ও গুণাগুণ আপনার মধ্যে আছে কিনা তা জানার জন্য যেসব পদক্ষেপ আপনাকে অনুসরণ করতে হবে তা হল :
• আত্মপ্রতিফলন: নিজের ভিতর কী ধরনের গুণাগুণ আছে তা যাচাই-বাছাই করে সামনে আনাই এ পদক্ষেপের প্রাথমিক কাজ। এর ফলে নির্দিষ্ট পদের জন্য আপনি কতটা যোগ্য তা বুঝতে পারবেন এবং সেইমত নিজেকে প্রস্তুত করতে পারবেন।
• আপনি কী জানতে চান: নির্দিষ্ট পদের জন্য আবেদন করতে বা প্রতিযোগিতা করতে আপনাকে কী কী বিষয় সম্মন্ধে জানতে হবে সে সম্পর্কে আপনাকে স্থির সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বিষয়সমূহ সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানতে পারলেই আপনার পক্ষে প্রস্তুতি নেয়া অনেক সহজ হবে।
• শক্তিশালী দিক: আপনার ভিতর যা আছে তার মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী কোনটি তা খুঁজে বের করুন। এটির উপস্থিতি ও চর্চা আপনাকে আত্মমর্যাদাশীল ও আত্মনির্ভরশীল করে তুলতে সাহায্য করবে।
• প্রস্তুতি: নিজেকে প্রস্তুত করতে হলে পর্যাপ্ত সময় দিন এবং নিজের প্রয়োজনসমূহ খুঁজে বের করতে মনোযোগী হন।
• চিহ্নিত করুন: সংযোগ স্থাপনের পূর্বে কার সাথে সংযোগ স্থাপন করতে হবে এবং কীভাবে তা করতে হবে স্থির করুন। আপনার সামর্থ্য ও যোগ্যতা সম্বন্ধে আপনি নিশ্চিত হলে সংযোগ স্থাপন সহজ হবে।
কীভাবে সংযোগ স্থাপন করা যায় ?
সংযোগ স্থাপন করতে আপনি বিভিন্ন প্রকার মাধ্যম ব্যবহার করতে পারেন। তবে আপনার ইচ্ছাই সব থেকে বড় কথা। অর্থাৎ যে ব্যক্তি বা দল তার নিজ বা দলের প্রয়োজনে অন্যের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করতে চায় তাকে নিজ থেকে উদ্যোগী হয়ে স্থির করতে হবে কোন কারণে সংযোগ স্থাপন করা দরকার এবং কী প্রকারে তা করা সম্ভব। সংযোগ স্থাপনের বিভিন্ন মাধ্যম আছে। যেমন:
সাক্ষাৎ করা: এক বা একাধিক ব্যক্তির সাথে সরাসরি সাক্ষাৎ করে সম্পর্ক স্থাপন করা যায়। এটি একটি শক্তিশালী মাধ্যম। কারণ ব্যক্তির সাথে ব্যক্তির সরাসরি দেখা হলে উভয়ের চাক্ষুস মিলন হয় এবং সেইসাথে দুজনের কাছে দুজনের অভিব্যক্তির প্রকাশ ঘটে। ফলে তারা একে অপরের মনের ভাব বা ইচ্ছা সম্পূর্ণ জানতে পারে। সম্পর্ক অনেক দৃঢ় হয় ।
দূরালাপনী বা ফোন করা: সম্পর্ক স্থাপনের ইচ্ছে নিয়ে একজন অপর জনের সাথে ফোনে কথা বলতে পারে। এ ব্যবস্থার সুবিধা এই যে, ব্যক্তি স্থানচ্যুত না হয়ে নিজের জায়গায় বসেই কথা বলতে পারেন। এতে সময়ও অনেক কম লাগে। তবে দীর্ঘ আলোচনার জন্য দূরালাপনী ব্যবস্থা তেমন সুবিধাজনক নয় ।
চিঠিপত্রের মাধ্যমে: সংযোগ স্থাপনের জন্য চিঠিপত্র বিনিময়ও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। চিঠি পোস্ট করে, কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে বা ব্যক্তির হাতে প্রেরণ করা যায়। চিঠিতে বক্তব্যের ভাব অনেক বিস্তৃতভাবে প্রকাশ করা যায় বটে তবে এ ব্যবস্থা অনেক সময় সাপেক্ষ। ব্যক্তি থেকে ব্যক্তির দূরত্ব যদি কম হয় তবে হাতে হাতে চিঠি পাঠান একটি উত্তম ব্যবস্থা ।
ই-মেইল করে: ই-মেইল সংযোগ স্থাপনের জন্য এক ধরনের ইলেকট্রনিক মেইল প্রক্রিয়া। ১৯৯৩ সাল থেকে এ প্রক্রিয়ার প্রচলন হয়েছে। এ ব্যবস্থায় একজন প্রেরক ও এক বা একাধিক গ্রাহকের মধ্যে ডিজিটাল তথ্যের আদান- প্রদান ঘটে। আধুনিক ই-মেইল প্রক্রিয়ায় তথ্য ইন্টারনেট মাধ্যমে চলাচল করে। এ প্রক্রিয়ায় আপনি যদি কোথাও ই- মেইল পাঠাতে চান তবে প্রথমে আপনার তথ্য টাইপ করে কম্পিউটারে লিখতে হবে এবং নির্দিষ্ট ঠিকানায় পাঠাতে হবে। এ তথ্য ইন্টানেটের মাধ্যমে গ্রাহকের ঠিকানায় সংরক্ষিত হয়। গ্রাহক তার সুবিধামত সময়ে নিজ একাউন্ট খুলে এ তথ্য পড়তে পারেন এবং একই প্রক্রিয়ায় প্রেরকের কাছে তার উত্তর পাঠাতে পারেন।
কাজ – দুই
চাকরি ক্ষেত্রে আপনার অবস্থান ও আপনার যোগ্যতা এ দুয়ের অসামঞ্জস্যের প্রতি অসন্তুস্টি জানিয়ে আপনার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে একটি চিঠি লিখুন। অথবা আপনার যোগ্যতার বিচারে কোন প্রতিষ্ঠানে শূন্য পদে আপনাকে বহাল করার আবেদন জানিয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে একটি পত্র লিখুন।
এসো আমরা কয়েকজন মানুষের জীবনের ঘটনা শুনি:
কেস স্টাডি ১ : আশিস রঞ্জন দে কুমিল্লায় বাস করেন । তিনি ছোটবেলা থেকেই নতুন নতুন মানুষের সাথে পরিচিত হতে খুব পছন্দ করতেন । যেখানে যার সাথেই তার দেখা হতো, তিনি তাদের সাথে সুসম্পর্ক তৈরি করতেন । তাদের সাথে তিনি নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে চলতেন। পড়াশোনা শেষ করার পর আশিস রঞ্জন দে একটি চাকরি পেলেন। কিন্তু তার ইচ্ছে ছিল, তিনি নিজের মতো করে একটা ব্যবসায় দাঁড় করাবেন ।
কী ব্যবসায় করলে ভালো হয়- তা নিয়ে তিনি পরিচিত মানুষের সাথে কথা বললেন । তার পূর্ব- পরিচিত ঢাকায় একজন নামকরা ব্যবসায়ীর কাছেও আশিস উপদেশ চাইলেন। সেই ব্যবসায়ী ভদ্রলোক আশিসকে বললেন, ‘ঢাকায় টাটকা সবজি পাওয়া খুব কঠিন। ঢাকার বড় বড় ডিপার্টমেন্টল স্টোরে সবজির নিয়মিত জোগান দিতে পারলে খুবই ভালো হয়।’ এই ব্যবসায় ভাবনাটা আশিসের ভালো লাগল ।
তিনি খোঁজ করে দেখলেন, ঢাকায় তার পরিচিত বেশ কয়েকজনের এ ধরনের ব্যবসায় রয়েছে। আশিস তাদের সাথে যোগাযোগ করে কোন ধরনের সবজি তাদের প্রয়োজন, কেমন দাম তারা দিতে পারবেন এবং কী পরিমাণ চাহিদা ইত্যাদি জেনে নিলেন। তারপর, এলাকার কয়েকজন সবজি চাষির সাথে কথা বললেন। সবজি চাষিরা তাকে জানাল, সব সময় তারা ভালো দাম পায় না ।
আবার, অনেক সময় যখন সবজি বিক্রির সময় আসে তখন ক্রেতা না পাওয়ার কারণে সবজি নষ্ট হয়ে যায় । আশিস একটা ট্রাক ভাড়া নিয়ে সবজি ক্ষেত থেকে টাটকা সবজি সংগ্রহ করে ঢাকায় সবজির জোগান দেওয়া শুরু করলেন। সবাই খুব খুশি হলো। কৃষকরা তাদের ফসলের ন্যায্য দাম পেল। ঢাকার বড় বড় দোকানের মালিকরা ক্রেতাদের নিকট ভালো সবজি বিক্রি করতে পেরে খুশি। সবাই আশিসের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠল । আর তার ব্যবসায়ও ধীরে ধীরে বাড়তে লাগল ।
কেস স্টাডি ২ : চাঁদপুরের ছোট্ট একটি গ্রামে জান্নাতুল ফেরদৌস বাস করেন। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা শেষ করে নিজের গ্রামেই একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠন গড়ে তোলেন। এ সংস্থার মাধ্যমে তিনি এলাকার মানুষকে শিক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন করে তোলেন । শিক্ষাজীবনে তাকে শিক্ষকেরা প্রায় বলতেন জীবনে উন্নয়নের জন্য সব সময় সবার সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলবে । এ কথা তিনি প্রায়ই মনে করেন । তাই তার পরিচিত সকলের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেন ।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় কাজ করতে গিয়ে তিনি বিভিন্ন প্রশিক্ষণ, সেমিনার, ওয়ার্কশপে অংশগ্রহণের সুযোগ পান । তিনি এখানে যাদের সঙ্গে পরিচিত হন তাদের সঙ্গেও যোগাযোগ রক্ষা করে চলেন । তিনি সব সময় তার এলাকার বিশুদ্ধ খাবার পানি সরবরাহ, শিশুদের ডায়রিয়া ও পানি বাহিত রোগের প্রকোপ, এগুলো নিয়ে ভাবতেন আর কীভাবে এ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায় তার পথ খুঁজতেন।
ঢাকার একটি সেমিনারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সাথে তার পরিচয় ঘটে। এ পরিচয়ের সূত্র ধরে তিনি তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেন। একদিন ঐ কর্মকর্তা জানালেন জান্নাতুলের সংস্থার মাধ্যমে তার এলাকার সমস্যা সমাধানে তারা পদক্ষেপ নিচ্ছেন । পরবর্তী সময়ে জান্নাতুল তার এলাকার সমস্যা সমাধানে সক্ষম হলেন। উল্লিখিত দুজন মানুষের জীবনের গল্প থেকে আমরা কী শিখলাম?
সম্পর্ক স্থাপন মানে চারপাশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সাথে পরিচিত হওয়া। তবে শুধু পরিচিত হলেই হবে না। তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করতে হবে । কাজেই, সম্পর্ক স্থাপন হলো কারও সাথে পরিচিত হয়ে তার সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করা । আশিস ও জান্নাতুল ফেরদৌসের জীবনের গল্প থেকে আমরা জেনেছি যে, তাদের কর্মক্ষেত্রে সফল হয়ে ওঠার পেছনে রয়েছে অসংখ্য মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন । সম্পর্ক স্থাপন অনেক রকম হতে পারে । যেমন-
- ব্যক্তিগত সম্পর্ক স্থাপন (যেমন আমাদের সহপাঠীদের সাথে আমরা ব্যক্তিগত সম্পর্ক স্থাপন করে থাকি; তাদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে চলি । বিপদে-আপদে একে অন্যের পাশে দাঁড়াই) ।
- পেশাগত সম্পর্ক স্থাপন (পেশাগত প্রয়োজনে, আমাদের অনেকের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করতে হয়। পেশাগত জীবনে সহকর্মীসহ অনেকের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করতে হয়)।
- সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক স্থাপন (একই সমাজে আমরা যারা বসবাস করি, তারা পরস্পরের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে সামাজিকভাবে ঐক্যবদ্ধ থাকি)।
এছাড়াও সম্পর্ক স্থাপন আরও অনেক রকম হতে পারে। তবে যেখানে যেমনই হোক না কেন, সম্পর্ক স্থাপন মানেই হলো যোগাযোগ স্থাপন এবং তা নিয়মিত রক্ষা করে চলা। নিয়মিত যোগাযোগ না থাকলে স্থাপিত সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় ।
সারসংক্ষেপ
পেশাগত জীবনে প্রবেশ থেকে শুরু করে ক্রমশ: উত্তরণ পর্যন্ত সবক্ষেত্রেই সংযোগ স্থাপন একটি অত্যাবশ্যকীয় প্রক্রিয়া। এ প্রক্রিয়ার জন্য নিজেকে গড়ে তুলতে হয় এবং সারাজীবন প্রয়োজনীয় গুণাবলির অনুশীলন করতে হয়। সংযোগ স্থাপন একটি অবিরত প্রক্রিয়া। ব্যক্তি কোন এক সময় তার নিজ প্রয়োজনে সংযোগ স্থাপন করল এবং পরবর্তীতে সে সম্পর্কের কোন খোঁজখবর করল না, এমন হলে সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়। পুণরায় সংযোগ স্থাপন করা খুবই দূরূহ কাজ। বিশেষ কিছু গুণাগুণের মাধ্যমে সংযোগ রক্ষা চলমান করতে হয়।
